স্বাধীনতার মহান পথযাত্রায় যে ঘৃণ্যতম অধ্যায়টি বাংলাদেশকে রক্তাক্ত করেছিল, তার কেন্দ্রে ছিল পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর অবিশ্বাস্য বিবৃতি ও স্বীকারোক্তি। ইতালীয় সাংবাদিক ও লেখিকা ওরিয়ানা ফালাচির বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি’তে সংকলিত সেই সাক্ষাৎকারটি ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক অশ্লীলতা ও ইতিহাস বিকৃতির দর্পণ। ভুট্টোর মুখ থেকে বেরিয়েছিল এমন সব কথা, যা পাকিস্তানি শাসকদের মানসিকতার গভীর ঘৃণ্য দিককে উন্মোচিত করেছে।
ভুট্টো নিজেকে ‘বামপন্থী’ দাবি করলেও তার বক্তব্যে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা ও অবজ্ঞা। তিনি মুজিবুর রহমানকে ‘মহামূর্খ’, ‘আজন্ম মিথ্যুক’ এবং ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার দাবি ছিল, বাংলাদেশে কোনো গণহত্যা ঘটেনি; ঘটলেও তা ছিল ‘জাতীয় ঐক্যের খাতিরে নীতিসম্মত’। এমনকি তিনি দাবি করেন, গণহত্যার প্রকৃত সংখ্যা ছিল মাত্র পঞ্চাশ হাজার, যেখানে মুজিব আর ভারত সরকার প্রচার করেছিল তিন মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু। ভুট্টোর ভাষায়, মুজিব ছিলেন একজন ‘অযোগ্য নেতা’, যার কোনো যোগ্যতাই ছিল না দেশ পরিচালনার।
ভুট্টোর সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে উঠে এসেছে পাকিস্তানি শাসকদের সেই মানসিকতা, যা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে কখনোই সমান মর্যাদা দিতে পারেনি। তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ছিল ‘দারিদ্র্যপীড়িত’, ঢাকা ছিল ‘আঁধারঘেরা নোংরা শহর’, আর মুজিব ছিলেন একজন ‘বাংলার বাঘ’ নামধারী নির্বোধ নেতা। তার বর্ণনায় বারবার ফুটে উঠেছে পূর্ব পাকিস্তানকে নিচু চোখে দেখার মনোভাব। তিনি দাবি করেন, মুজিবের বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবই বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত কারণ ছিল। ভুট্টো বলেন, মুজিব চেয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করে ফেলতে এবং তার সাথে ভারতের যোগাযোগ ছিল। এমন অভিযোগের কোনো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করতে পারেননি।
গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়েও ভুট্টোর বক্তব্য ছিল পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর। তিনি দাবি করেন, সামরিক হস্তক্ষেপ ছিল ‘নীতিসম্মত’ এবং স্টালিন ও মাও সে তুংয়ের মতো নেতাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনীয়। তার ভাষায়, সামরিক বাহিনীর নেতা টিক্কা খান ছিলেন একজন দক্ষ সেনাপতি যিনি কেবলমাত্র নির্দেশ পালন করেছিলেন। ভুট্টোর দাবি ছিল, গণহত্যার ঘটনা অতিরঞ্জিত করা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ ছিল অপ্রয়োজনীয়। এমনকি তিনি দাবি করেন, উদ্বাস্তুদের সংখ্যাও অতিরঞ্জিত ছিল এবং তাদের অনেকেই আসলে পশ্চিম বাংলা থেকে প্রেরিত হয়েছিল।
ভুট্টোর এই সাক্ষাৎকার শুধু তার ব্যক্তিগত ঘৃণা ও বিদ্বেষেরই প্রকাশ ঘটায়নি, বরং পাকিস্তানি শাসকদের সেই মানসিকতারও প্রতিফলন ঘটিয়েছে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পথকে রক্তাক্ত করেছিল। তার ভাষায় মুজিব ছিলেন একজন ‘ভিতু নেতা’, যিনি কখনোই সাহস দেখাতে পারেননি। এমনকি মুজিবকে গ্রেপ্তারের পর তাকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়েও ভুট্টো বলেন, তিনি মুজিবকে ক্ষমা করেছিলেন যাতে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মহলে সহানুভূতি অর্জন করতে পারে। তিনি দাবি করেন, মুজিব ছিলেন তাদের মতোই একজন পাকিস্তানি এবং তাদের মধ্যে গভীর বন্ধন ছিল। ভুট্টোর এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের মুখোমুখি হতে হয় প্রতিটি বাংলাদেশির।
মন্তব্য করুন