১৯৯৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘ব্রেভহার্ট’ আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়। পাঁচটি অস্কার জয় করা এই চলচ্চিত্রটির পেছনে রয়েছে এক অসাধারণ প্রেরণার গল্প। র্যান্ডল ওয়ালেস নামের এক চলচ্চিত্র নির্মাতা তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে ঈশ্বরের কাছে একটি প্রার্থনা করেছিলেন, আর সেই প্রার্থনাই পরবর্তীকালে জন্ম দেয় ইতিহাসের সেই অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্রটির।
ওয়ালেস তাঁর শৈশব কেটেছে ভার্জিনিয়ার লিঞ্চবার্গে। তাঁর জীবনে দুটি ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রথমটি তাঁর পিতার জীবনের একটি কঠিন অধ্যায়—যেখানে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাকরি হারিয়েছিলেন, যার ফলে তাঁর পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। দ্বিতীয়টি তাঁর নিজের জীবনের সেই মুহূর্তটি যখন তিনি নিজেও হতাশায় ভুগছিলেন। একটি লেখক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন যখন থমকে দাঁড়ায়, তখন তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন একেবারে ভেঙে পড়তে। সেই সময় তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থনাটি করেছিলেন: “প্রভু, আমার ছেলেদের জন্য যা ভালো, তাই হোক।” আর তারপরই তিনি লিখতে শুরু করেন ‘ব্রেভহার্ট’-এর কাহিনী।
ওয়ালেসের পিতা তাঁকে বলেছিলেন যে তিনি যেকোনো কলেজে পড়তে পারেন, এমনকি সবচেয়ে ব্যয়বহুল কলেজেও। কিন্তু স্নাতক হওয়ার পর ওয়ালেস তাঁর পিতার স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর প্রথম চাকরি ছিল ন্যাশভিলের একটি থিম পার্কে, যেখানে তিনি একটি পিয়ানো বাজানো শূকর এবং একটি ড্রাম বাজানো হাঁসের দেখভাল করতেন—এমন একটি চাকরি যা তাঁর পরিবারের কাছে ছিল হাস্যকর। কিন্তু ওয়ালেস হাল ছাড়েননি। তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে যান এবং সেখানে একটি টিভি প্রোডাকশন স্টুডিওতে কাজ শুরু করেন। বিবাহিত জীবনেও সুখ ছিল তাঁর জীবনে, কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁর জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। ওয়ারাইটার্স গিল্ডের ধর্মঘট তাঁকে চাকরি থেকে বঞ্চিত করে, তাঁর সঞ্চয়ও শেষ হয়ে যায়। প্রায় ভেঙে পড়ার মুহূর্তে তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থনাটি করেছিলেন।
প্রার্থনাটি ছিল অত্যন্ত সরল ও আন্তরিক। তিনি বলেছিলেন, “প্রভু, আমার ছেলেরা যেন কোনো বড় বাড়িতে বড় হয়ে না ওঠে, তাদের যেন একটা সাধারণ জীবন উপহার দেওয়া যায়।” এ কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ ভেঙে পড়েছিল। সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর পিতার মতো তিনিও তাঁর পরিবারকে আগলে রাখতে পারবেন। প্রার্থনার পর তিনি ‘ব্রেভহার্ট’-এর স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু করেন। তাঁর জীবনের সেই মুহূর্তটি এতটাই অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল যে, শ্রোতারা নীরবে তাঁর কথা শুনেছিলেন—কোনো করতালি ছিল না, কারণ সেই মুহূর্তটির গুরুত্ব ছিল অসাধারণ।
ওয়ালেস তাঁর প্রার্থনার কথা বলার সময় বাইবেলের সেই ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন, যেখানে ক্রুশবিদ্ধ যীশু তাঁর একদিকে অবস্থানরত চোরকে বলেছিলেন, “আজ তুমি আমার সঙ্গে স্বর্গরাজ্যে থাকিবে।” ওয়ালেস বিশ্বাস করতেন যে প্রার্থনা শুধুমাত্র ঈশ্বরের কাছে আবেদন নয়, বরং নিজের জীবনের প্রতি নিজের দায়িত্ববোধকেও প্রকাশ করে। তিনি বলেছিলেন, “আমি জানি না প্রার্থনা ঈশ্বরের মন পরিবর্তন করে কি না, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তা আমাকে পরিবর্তন করে।” তাঁর জীবনের এই সত্যটিই তাঁকে ‘ব্রেভহার্ট’-এর মতো মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুপ্রাণিত করেছিল।
মন্তব্য করুন