পূর্ব উগান্ডার সবুজ ঘাসে মোড়া মাঠে এখন এক অন্য ধরনের উল্লাস শোনা যায়। হাসির রোল আর গানের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। পঞ্চাশ থেকে নব্বই বছর বয়সী একদল নারী দলে দলে এসে দাঁড়ান ক্রিকেট ব্যাট হাতে। তাঁদের মুখের আনন্দ আর দেহের তৎপরতা দেখে বার্ধক্যের গণ্ডিকে যেন ছাড়িয়ে গেছেন তাঁরা। খেলার মাঠে তাঁদের জয়গান গাইছে পুরো গ্রাম।
এই দলটির পরিচিতি এখন ‘ক্রিকেট গ্র্যানিজ’ বা ক্রিকেট খেলা দাদি-নানিদের দল হিসেবে। শুরুতে ক্রিকেট খেলার সঙ্গে তাঁদের কোনো পরিচয়ই ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই খেলাই হয়ে উঠেছে তাঁদের জীবনের নতুন আলো। শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক চাপ আর একাকিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ক্রিকেট। রাজধানী কাম্পালা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে জিনজা জেলার একটি খেলার মাঠে প্রতি শনিবার জড়ো হন তাঁরা। পরনে সাধারণ সালোয়ার-কামিজ বা টপস, বেশিরভাগেরই পায়ে জুতো নেই। কিন্তু তাতে কী! ব্যাট হাতে তাঁদের দৌড় আর শটের ছন্দেই যেন জীবনের নতুন স্পন্দন ফিরে আসে।
৭২ বছর বয়সী জেনিফার ওয়াইবি নানিয়োঙ্গা নামের এক দাদি বলছিলেন, ‘আগে পায়ের ব্যথায় হাঁটতে পারতাম না, আর পিঠের ব্যথার জন্য প্রায়ই ডাক্তারের কাছে যেতে হতো। কিন্তু গত এক বছর ধরে ক্রিকেট খেলা শুরু করার পর সব ব্যথাই যেন মিলিয়ে গেছে। এখন নিজের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা করতেও কোনো অসুবিধা হয় না।’ তাঁর কাছে ক্রিকেট এখন এক ধরনের থেরাপি। এছাড়াও, তাঁর ২৯ জন নাতি-নাতনি রয়েছে, আর তাদের সঙ্গে খেলাধুলায় অংশ নেওয়া তাঁর জন্য গর্বের বিষয়।
এই উদ্যোগের শুরুটা হয়েছিল ২০২৫ সালে কিবুবুকা নামের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। তখন মাত্র ১০ জন বয়স্ক নারীকে নিয়ে ক্রিকেট খেলা শুরু হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো অঞ্চলে। মজার ব্যাপার হলো, এই উদ্যোগটি আসলে শুরু হয়েছিল শিশুদের জন্য। কোচ অ্যারন কুসাসিরা লক্ষ করেন যে বড়রা খেলাধুলা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ হওয়ায় তাঁদের সন্তানদের মাঠে পাঠাতে দ্বিধা করছেন। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন বয়স্কদেরও খেলার সুযোগ করে দেবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন মাঠে দৌড়াদৌড়ি করি, ব্যায়াম করি আর খেলাধুলা করি, তখন তাঁরা নিজেদের অজান্তেই অনেক বেশি নড়াচড়া করেন। এই ব্যায়াম তাঁদের শরীরের জন্য অনেক উপকারী।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা অসংক্রামক ব্যাধির অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্বব্যাপী নারীরাই এর ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। অলস জীবনযাপনের কারণে প্রতি বছর প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি ডলার ব্যয় হয় জনস্বাস্থ্য খাতে। উগান্ডার এই দাদি-নানিরা যেন সেই পরিসংখ্যানকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। তাঁদের খেলাধুলা শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যই উন্নত করছে না, সঙ্গে মানসিক প্রশান্তিও এনে দিচ্ছে।
শারীরিক উপকারের বাইরে এই ক্রিকেট মাঠ তাঁদের সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। প্যাট্রিসিয়া নামের এক দাদি বলেন, ‘ঘরে একা থাকলে সব সময় মন খারাপ থাকে, দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরে। কিন্তু মাঠে এলে সবার সঙ্গে কথা বলা যায়, মনের কথা ভাগাভাগি করা যায়। এখানে আসার পর থেকে মনটা অনেক হালকা লাগে।’ জেনিফার নানিয়োঙ্গাও একই কথা বলেন, ‘মাঠ থেকে ফিরে আসার সময় মনে হয় যেন এক নতুন দিনের শুরু হলো। সব দুশ্চিন্তা মিলিয়ে গেছে।’
কোচ কুসাসিরার জন্য এই উদ্যোগটি একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বড়দের মন জয় করার ফলে এখন এলাকার শিশুদের ক্রিকেট খেলাতে কোনো বাধা থাকে না। তিনি বলেন, ‘ছোট থেকে বড়—সবার মুখে যখন হাসি দেখি, তখন মনে হয় দিনটা সফল হয়েছে। আমার কাছে তা-ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ এই ক্রিকেট দলের সদস্যরা শুধু নিজেদের জীবনই বদলে দিচ্ছেন না, সঙ্গে পুরো গ্রামের মানুষকেও অনুপ্রাণিত করছেন। তাঁদের এই উদ্যোগ যেন বার্ধক্যের সঙ্গে লড়াই করার এক নতুন পথের দিশারি।
মন্তব্য করুন