ঈদের ছুটির দিনে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগ যেন পরিণত হয়েছিল এক দুর্ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে। রোববার সকাল সাতটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত মাত্র নয় ঘণ্টার ব্যবধানে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসা নিতে আসেন ১১৪ জন রোগী। এর মধ্যে গুরুতর আঘাতের কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ২২ জনকে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, ঈদের দিন শনিবারও একই ধরনের চিত্র দেখা গিয়েছিল—সেদিনও ২৬৯ জনকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ দুর্ঘটনাই ঘটেছে অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনার কারণে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল এবং অন্যান্য যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মানুষ আহত হচ্ছেন।
রোববার বিকেলের দিকে রাজধানীর রায়েরবাজারের আজিজ খান সড়কের ঘটনাটি তারই একটি উদাহরণ। প্রায় আড়াই বছর বয়সী আবু সাঈদের মুখে, মাথায় ও পায়ে আঘাত লেগেছে অটোরিকশার ধাক্কায়। মা নাজমা বেগম ও বাবা মোহাম্মদ সেলিম তাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে। সেলিম দুঃখের সঙ্গে বলেন, ‘আমার ছেলে রাস্তার পাশে খেলছিল। হঠাৎ একটা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এসে তাকে ধাক্কা মারে। চালক ঘটনাস্থলেই গাড়ি রেখে পালিয়ে যায়।’ সাঈদের মাথায় তখনও রক্তের দাগ ছিল, মুখে ব্যথা নিয়ে তিনি কান্নাকাটি করছিলেন।
পঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক অপু মজুমদার জানান, ঈদের ছুটিতে সড়কে যানবাহনের চাপ কম থাকায় অনেকেই বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে থাকেন। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘটছে অনেক দুর্ঘটনা। তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল বা সিএনজির চালকরা অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হন। ফলে আহত ব্যক্তিদের মধ্যে হাত-পা ভাঙা, মচকানো এবং গুরুতর আঘাতের ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে।’
একই দিনে আরও কয়েকটি ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। মাদারীপুরের রাজৈরের বাসিন্দা জনি খান ঈদের ছুটিতে গ্রামে গিয়েছিলেন। ঢাকায় কারওয়ান বাজারের একটি মাংসের দোকানে কাজ করেন তিনি। অটোরিকশার ধাক্কায় তার ডান পা হাঁটুর নিচে ভেঙে যায়। ভাই রাজন খান বলেন, ‘তিনি গ্রামের পাশের একটি চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে চা খাচ্ছিলেন। হঠাৎ দ্রুতগতির একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার পায়ে ধাক্কা মারে।’
আবার সিরাজগঞ্জের সোলেমান প্রামাণিক নিজেই রিকশা চালাচ্ছিলেন। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজেই পড়ে গিয়ে ডান পায়ের গোড়ালিতে গুরুতর আঘাত পান। তার ছেলে শফিকুল প্রামাণিক জানান, সকালে বাজার থেকে একটি হাঁস কিনে বাড়ি ফিরছিলেন তার বাবা। হাঁসটি উড়াল দিলে ধরতে গিয়ে রিকশার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে। চিকিৎসকেরা জানান, সোলেমানের পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তাকে রড লাগাতে হতে পারে।
পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, রোগীদের আঘাতের ধরন অনুযায়ী ভর্তি করা হচ্ছে। গুরুতর আহতদের চিকিৎসা চলছে, অন্যদের চিকিৎসা দেওয়ার পর বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে চিকিৎসকরা সকলকে সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনা দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। তারা জনসচেতনতা বৃদ্ধির উপর জোর দিয়েছেন যাতে ঈদের মতো ছুটির দিনেও সড়কে শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
মন্তব্য করুন