ঈদের আনন্দে মেতে থাকার পর যখন উৎসবের ছুটি শেষ হয়, তখন অনেকেরই শরীর হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর। এক মাসের সংযমের পর পোলাও, কোরমা, মিষ্টান্ন আর রেড মিটের ভারি খাবার পরিপাকতন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত তেল, মসলা ও চিনির কারণে অনেকেই ঈদের পর অ্যাসিডিটি, বুক জ্বালাপোড়া, পেট ফাঁপা কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে শরীরকে পুনর্গঠনের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
ঈদের পর প্রথম কয়েক দিন শরীরকে সহজে হজম করতে পারে এমন খাবার গ্রহণ করা উচিত। অতিরিক্ত তৈলাক্ত ও মসলাদার খাবার পরিহার করে হালকা ও সুষম খাদ্যাভ্যাসে ফিরে আসা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত পানি পান করা, আঁশজাতীয় খাবার গ্রহণ এবং প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া শরীরকে দ্রুত সুস্থ করে তুলতে সাহায্য করবে। এছাড়া নিয়মিত হাঁটা ও পরিমিত খাবার গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের কারণে শরীরে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ জমা হতে পারে। এই টক্সিন দূর করতে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। দিনে অন্তত ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। সকালে কুসুম গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে খেলে তা লিভারকে পরিষ্কার করতে এবং হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। এছাড়া ডাবের পানি ও বিভিন্ন ধরনের ফলের রসও শরীরের জন্য উপকারী।
এক মাসের সংযমের পর অনেকেই ঈদের সময় ভারি খাবার খেয়ে ফেলেন। ফলে অন্ত্র পরিষ্কার করতে আঁশজাতীয় খাবারের কোনো বিকল্প নেই। শাকসবজি, ফলমূল এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল খেলে অন্ত্রের কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকে। বিশেষ করে পেঁপে, শসা, লাউ ও অন্যান্য সবুজ শাকসবজি পেটের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক। এসব খাবার হজম প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে।
পেটের অস্বস্তি কমাতে টক দই একটি মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। টক দইয়ে উপস্থিত প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া হজম শক্তি বৃদ্ধি করে এবং পেট ফাঁপা কমাতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুরের খাবারের পর এক বাটি টক দই খেলে শরীর অনেকটা আরাম অনুভব করে। এছাড়া অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার যেমন ছানা বা দই জাতীয় খাবারও খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
ঈদের পর কয়েকদিনের জন্য লাল মাংস ও অতিরিক্ত চিনি জাতীয় খাবার পুরোপুরি এড়িয়ে চলা উচিত। এসব খাবার পরিপাকতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। পরিবর্তে মাছ, পাতলা ডাল ও সবজি খাওয়া উচিত। চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে ডাবের পানি বা লেবুর শরবত পান করা বেশি উপকারী। এছাড়া একবারে অনেকটা না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খেলে লালাগ্রন্থি সক্রিয় হয় এবং হজম প্রক্রিয়া সহজ হয়।
শরীরকে সুস্থ রাখতে শুধু খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ নয়, শারীরিক সক্রিয়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারী খাবার খাওয়ার পর আলসেমি আসতে পারে, কিন্তু শরীরকে সচল রাখা জরুরি। প্রতিদিন সকালে বা বিকেলে অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা শরীরের বিপাক প্রক্রিয়াকে সচল রাখে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এছাড়া ইয়োগা বা ব্যায়াম করলে শরীরের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং মনোবল শক্তিশালী হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঈদের পরপরই কঠোর কোনো ডায়েট শুরু করা উচিত নয়। এতে শরীর আরও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। বরং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ও সুষম খাদ্যাভ্যাসে ফিরে আসাই শ্রেয়। পরিমিতিবোধ এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসই পারে উৎসবপরবর্তী শারীরিক অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিতে। যেকোনো ধরনের অস্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী না করে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। সুস্থ শরীরই পারে প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করতে।
মন্তব্য করুন