ProbasiNews
২১ মার্চ ২০২৬, ৪:১৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ঈদের আনন্দে সুন্নতের অনুসরণ: যা করবেন আর যা থেকে বিরত থাকবেন

আল্লাহর নেয়ামতের অন্যতম প্রতীক ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। মুসলিম উম্মাহর জন্য এই দুই উৎসব আনন্দ, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মহিমাময় বার্তা বহন করে। কিন্তু অনেক সময় উৎসবের আনন্দে ভেসে গিয়ে আমরা ভুলে যাই ইসলামের মৌলিক বিধানকে। ঈদের দিনে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো জানা থাকলে এই মহান দিনটির পুরো উপকারিতা লাভ করা যায়।

ঈদের দিনে সর্বপ্রথম যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত তা হলো পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। এটি মূলত শরীর ও মনকে পরিচ্ছন্ন রাখার শিক্ষা দেয়। তাছাড়া ইসলামে যেকোনো ইবাদতের আগে পরিচ্ছন্নতা অপরিহার্য। তাই ঈদের দিনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করে ঘর থেকে বের হওয়া সুন্নতের অনুশীলন।

ঈদের আনন্দকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে চাইলে তাকবিরের গুরুত্ব ভুলে গেলে চলবে না। ঈদুল ফিতরের দিন সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বেশি বেশি তাকবির পাঠ করা মুস্তাহাব। আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু… এভাবে উচ্চৈঃস্বরে তাকবির পাঠ করলে আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও আনুগত্য প্রকাশ পায়। সাহাবিরা যেমনটি করতেন, আমাদেরও উচিত ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবির উচ্চারণ করা। এটি শুধু ইবাদত নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীকও বটে।

ঈদের দিনে নতুন পোশাক পরিধান করা একটি সুন্নত। তবে নতুন পোশাক না থাকলে পরিষ্কার ও সুন্দর পোশাক পরলেও চলবে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, পোশাকের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। তাই ফ্যাশনের চেয়ে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। মহানবী (সা.) দুই ঈদেই উত্তম পোশাক পরিধান করতেন বলে বর্ণিত আছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাকওয়ার পোশাক পরিধান করা—অর্থাৎ নিজেকে পাপাচার থেকে বিরত রাখা।

ঈদের দিনে ফিতরা আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে রমজানের রোজার যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর হয় এবং গরিব-দুঃখীদের মুখে হাসি ফোটে। ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী ঈদের নামাজের আগেই ফিতরা আদায় করতে হবে। নামাজের পরে আদায় করলে তা সাধারণ সদাকার পর্যায়ে পড়বে। এছাড়া ঈদের নামাজের আগে বিজোড় সংখ্যক খেজুর বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া সুন্নত। এটি রমজানের রোজা শেষ হওয়ার প্রতীক।

ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক পথে যাওয়া এবং অন্য পথে ফেরা মুস্তাহাব। এর ফলে অধিক মানুষের সাথে দেখা হয় এবং সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হয়। সম্ভব হলে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। চলার পথে প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের খোঁজখবর নেওয়া ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সুরা নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া অনাথ ও ইয়াতিমদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা ইসলামী সমাজব্যবস্থার অন্যতম দিক।

ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার অন্যতম মাধ্যম হলো পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়। সাহাবিরা একে অপরকে বলতেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’—অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের এবং আপনার ইবাদত কবুল করুন। হাসিমুখে শুভেচ্ছা বিনিময় করা ইমানের সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই ইসলামী শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে। অপ্রয়োজনে অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে দেহ স্পর্শ করা বা অস্বাভাবিক আচরণ করা ইসলাম সমর্থন করে না।

ঈদের দিনে যেসব বিষয় থেকে বিরত থাকা উচিত তার মধ্যে অন্যতম হলো অতিরিক্ত নফল নামাজ আদায় করা। ঈদের নামাজের আগে বা পরে কোনো নফল নামাজ নেই। এছাড়া ঈদের দিন রোজা রাখা সম্পূর্ণ হারাম। মহানবী (সা.) দুই ঈদেই রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। অনেকেই মনে করেন যে, ঈদের দিন রোজা রাখলে বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এছাড়া নতুন পোশাক বা রান্নাবান্নার ব্যস্ততায় ঈদের ওয়াজিব নামাজ আদায় করতে অবহেলা করা উচিত নয়। নামাজ ইসলামের পাঁচ স্তম্বের অন্যতম। তাই কোনোভাবেই এর অবহেলা করা যাবে না।

অনেকেই মনে করেন যে, ঈদের দিন বিশেষভাবে কবর জিয়ারত করা উচিত। ইসলামে কোনো দিনকে বিশেষভাবে কবর জিয়ারতের জন্য নির্ধারণ করা হয়নি। তবে প্রয়োজনে যে কোনো দিন কবর জিয়ারত করা যায়। আবার অনেকে ঈদগাহে কোলাকুলিকে আবশ্যক ইবাদত মনে করেন। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ইসলামে মুসাফাহা বা কোলাকুলি করা বৈধ, তবে একে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা যাবে না। আবার অনেকেই ঈদের আনন্দে গানবাজনা, জুয়া বা অপচয়ে লিপ্ত হন। ইসলামে এসব কাজ সম্পূর্ণ হারাম। ঈদ কেবল উৎসব নয়, বরং আত্মশুদ্ধির একটি বিরাট সুযোগ। তাই এই দিনটিকে ইসলামী বিধিবিধান মেনে উদযাপন করা উচিত।

পরিশেষে বলা যায়, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা মুসলিম জীবনের দুটি মহান উৎসব। এই উৎসবের প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করতে হলে ইসলামের বিধান মেনে চলতে হবে। পরিচ্ছন্নতা, ইবাদত, সামাজিক সম্প্রীতি ও তাকওয়ার পোশাক পরিধান—এসব বিষয় মেনে চললে ঈদের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে ঈদের প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করার তাওফিক দান করুন।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২০২৬ সালে কর্মী ছাঁটাইয়ের তালিকায় মেটা, অ্যামাজন, ইপিক গেমস — জানুন বিস্তারিত

এক্স-এ আলোড়ন! এলন মাস্কের হস্তক্ষেপে থমকে দাঁড়ালো ট্রলদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণ স্থগিত রাখতে যুগান্তকারী আইন আনছেন স্যান্ডার্স ও এওসি

এপস্টাইনের কেলেঙ্কারী: যুক্তরাজ্য ছাড়ার পরামর্শ রাজকুমারী বিট্রিসকে

যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বিপদ ঘনীভূত! প্রস্তাবিত সমাধানই কি বিপরীতমুখী ফল আনবে?

‘ডেয়ারডেভিল: বর্ন অ্যাগেইন’ সিজন ২ এপিসোড ২ এর মুক্তির তারিখ ও দেখার উপায়

আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এমন কিছু ভুল করবেন না যাতে হতে পারে আইআরএস অডিট

ব্রক লেসনার তাঁর বুকের বিশাল তরবারি ট্যাটুর পিছনের অদ্ভুত গল্পটি ফাঁস করলেন!

নতুন বাড়ির পিছনের জলাশয়ে মিলল অপ্রত্যাশিত অতিথি! রোজিনের জীবনে যোগ দিল এক ব্যাঙ

২০২৬ সালের হারিকেন মরশুমে বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে ‘সুপার এল নিনো’! আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস

১০

ছবির দিনের ঠিক আগ মুহূর্তে মা যখন দেখলেন সন্তানের মুখে মার্কার কলমের ছোপ!

১১

ডেলিভারি ড্রাইভারের আবেগঘন স্বীকারোক্তি: তিন বছরের ‘পোষা প্রাণীর বন্ধুত্ব’!

১২

বিশ্বখ্যাত কোচ ব্র্যাড স্টিভেন্সের পদ প্রত্যাখ্যান! ইউনিসিকে দিলেন ফিরিয়ে

১৩

নির্মাণ প্রকল্প পরিচালনায় বিপ্লব আনতে এআই এজেন্ট তৈরি করল স্টার্টআপ, উঠল ৯ মিলিয়ন ডলার

১৪

১৪ বছর বয়সে ক্যান্সার প্রতিরোধে বিপ্লব: হার্ভার্ডের ছাত্রীর উদ্যোগে ৪০ হাজার যুবকের সামিল হওয়া

১৫

মেগান মার্কলের একপাত্র স্প্যাগেটি: মাত্র বিশ মিনিটে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবার

১৬

হঠাৎ ছুটি মানেই এখন বিমানযাত্রা নয় — দাম আর সময়ের ভোগান্তিতে পাল্টে যাচ্ছে ভ্রমণের ধারা

১৭

আয়ের থেকে কম নিয়ে জীবনের ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব? একজনের অভিজ্ঞতা

১৮

গাড়ি ছাড়াই ভ্রমণের জন্য আদর্শ সাতটি মার্কিন শহর

১৯

ভাইরাল হওয়া আমার বেকারিকে বাঁচিয়েছিল, কিন্তু কখনোই অর্থের জন্য নয়

২০