ঈদের আনন্দে মাতোয়ারা জনপদ কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা। আর সেই আনন্দের সাথে যুক্ত হলো নতুন এক বিনোদনকেন্দ্র। স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ‘গ্রামের বাড়ি পার্ক’ নামের এই উদ্যানটি। ঈদের প্রথম দিন অর্থাৎ গতকাল শুক্রবার উদ্বোধনের পর থেকেই দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে পার্কটি। গ্রামীণ আবহ ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে নির্মিত এই পার্কটি স্থানীয়দের কাছে পরিণত হয়েছে এক নতুন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে।
পার্কটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও এলাকাবাসী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারা পার্কটির নির্মাণকাজের প্রশংসা করেন এবং এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নে এর ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। পার্কটির নির্মাণে স্থানীয় প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এটি পরিণত হয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা হিসেবে। পার্কটির বিভিন্ন স্থানে রয়েছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলনা, হস্তশিল্পের প্রদর্শনী, পল্লীগীতির আয়োজন এমনকি স্থানীয় খাদ্য সামগ্রীর স্টলও। ফলে দর্শনার্থীরা একইসাথে আনন্দ উপভোগ ও গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে পারছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, ‘আমরা অনেকদিন ধরেই এমন একটি পার্কের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এটি শুধু বিনোদনের স্থান নয়, আমাদের সন্তানদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানানোরও একটা মাধ্যম।’ অন্যদিকে পার্কটিতে ঘুরতে আসা শিক্ষার্থী তানিয়া বলেন, ‘এখানে এসে গ্রামের খাল-বিল, মাঠ-ঘাটের পরিবেশ দেখে আমার নিজের গ্রামের কথা মনে পড়ছে। পরিবার নিয়ে আসলে অনেক ভালো লাগে।’
পার্কটির নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে স্থানীয় উপকরণ ও কারুশিল্প। ফলে এটি হয়ে উঠেছে এলাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক প্রতীক। পার্কটির প্রধান প্রবেশপথেই রয়েছে বিশালাকার একটি গ্রামীণ ঘরের আদলে নির্মিত প্রবেশ তোরণ। এর পাশেই রয়েছে একটি কৃত্রিম পুকুর, যেখানে প্রতিনিয়ত জেলেদের অভিনয় দেখা যায়। পার্কটির অভ্যন্তরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছগাছালি, যার মধ্যে রয়েছে স্থানীয় ফলের গাছ ও ঔষধি বৃক্ষ। ফলে এটি হয়ে উঠেছে একাধারে বিনোদনের স্থান, শিক্ষার কেন্দ্র ও পরিবেশ সংরক্ষণের উদাহরণ।
স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই পার্কটি নির্মাণের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করা। একইসাথে পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটানো। ইতিমধ্যেই পার্কটির উদ্বোধনের পর থেকে দর্শনার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পার্কটিতে দর্শনার্থীদের আগমনের ফলে তাদের ব্যবসাও সমৃদ্ধ হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় খাদ্যদ্রব্য, হস্তশিল্প ও খেলনার বিক্রিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তবে পার্কটির পরিচালনা ব্যবস্থা নিয়ে কিছুটা অসন্তোষও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পার্কটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পার্কটির অভ্যন্তরে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ জমে থাকতে দেখা যায়। এছাড়া পার্কটিতে প্রবেশের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণ করা হয়নি বলে অনেকেই পার্কটিকে যথাযথভাবে পরিচালনা করার জন্য সরকারি উদ্যোগের প্রত্যাশা করছেন।
এ বিষয়ে দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শাহেদুল ইসলাম জানান, ‘পার্কটির পরিচালনা ব্যবস্থা নিয়ে আমরা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছি। শীঘ্রই পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। এছাড়া পার্কটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনেরও পরিকল্পনা রয়েছে।’ তিনি আরও জানান, পার্কটিতে পর্যটকদের সুবিধার্থে আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।
গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে নির্মিত ‘গ্রামের বাড়ি পার্ক’ ইতিমধ্যেই স্থানীয়দের কাছে হয়ে উঠেছে এক জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র। এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নে এই পার্কটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে এর সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য প্রয়োজন সরকারি ও স্থানীয় উদ্যোগের সমন্বয়। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলে এই পার্কটি হয়ে উঠতে পারে এলাকার গর্ব ও পর্যটন সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্তের সূচনা।
মন্তব্য করুন