যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের তৃতীয় সপ্তাহ শুরু হয়েছে। তবে ইউরোপীয় নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই যুদ্ধে অংশ নেবেন না। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ট্রাম্পের চাপ সত্ত্বেও ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের নৌবাহিনীকে সেখানে পাঠাতে রাজি নয়। বরং তাঁরা কূটনৈতিক সমাধানের পথেই হাঁটতে চান।
গত সোমবার জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস বলেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এটি শুরু করিনি।’ একই দিন ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের নৌবাহিনী পূর্ব ভূমধ্যসাগরে রক্ষণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও স্পষ্ট জানান, তাঁর দেশ ইরানের সঙ্গে বিস্তৃত যুদ্ধে জড়াবে না। ট্রাম্পের সমালোচনা এড়িয়ে স্টারমার বলেন, ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষায় তাঁর সরকার দৃঢ় অবস্থানেই থাকবে।
ট্রাম্পের উস্কানিমূলক বক্তব্যে ইউরোপীয় নেতারা উদ্বিগ্ন। রোববার এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টায় ইউরোপীয় দেশগুলো যোগ না দিলে তা ন্যাটোর ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক হবে। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, হরমুজ বন্ধ করার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো দ্রুতই সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা অবশ্য তাঁর এই দাবিকে উড়িয়ে দেন। তাঁদের বক্তব্য, ন্যাটো একটি রক্ষণাত্মক সামরিক জোট, যা আত্মরক্ষার জন্যই গঠিত। এ কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের ইচ্ছায় যুদ্ধে অংশ নেবে না।
ইউরোপীয় নেতাদের অনাগ্রহের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্বেগ। জ্বালানির দাম ইতিমধ্যেই আকাশচুম্বী হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। আবার ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি তাঁদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। ওই যুদ্ধে ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরাকে হামলা চালানো হয়েছিল, যা একটি ব্যর্থ উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও ট্রাম্প প্রশাসনের জেদ ইরানকে কেন্দ্র করে পুনরায় যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে ইউরোপীয় নেতারা মনে করছেন।
জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিস্টোরিয়াস স্পষ্ট জানান, তাঁরা কূটনৈতিক সমাধানেই বিশ্বাস করেন। ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিও একই কথা বলে। তাঁদের নৌবাহিনী পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করলেও তা কেবল রক্ষণাত্মক উদ্দেশ্যে। ইতালিও হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেন, ‘আমরা হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযানে যুক্ত নই।’ তাঁর মতে, ইউরোপের কোনো দেশই জোর করে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রস্তাব দেয়নি।
ইউরোপীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নতুন অভিযোগ হলো, ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য যথেষ্ট ব্যয় করে না। রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ‘কোনো দেশ আমাদের এই প্রচেষ্টায় সাহায্য করবে না, তা দেখা বেশ মজার হবে।’ তবে ইউরোপীয় নেতারা তাঁর এই অভিযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাডোস্লাভ সিকোরস্কি বলেন, সরকারের ভেতরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে ট্রাম্প ন্যাটোকে ‘আমাদের’ না বলে ‘তারা’ বা ‘ইউরোপ’ বলে সম্বোধন করছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে প্রাথমিক আক্রমণে অংশ না নেওয়ায় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বারবার ট্রাম্পের সমালোচনার মুখোমুখি হন। স্টারমার তাঁর বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এটি ন্যাটোর কোনো অভিযান নয়। তিনি স্পষ্ট জানান, যুক্তরাজ্য ইরানের সঙ্গে কোনো বিস্তৃত যুদ্ধে জড়াবে না। একই সঙ্গে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে তাঁর দেশ ইরান সংক্রান্ত বিষয়ে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে মিলে কাজ করবে। ইউরোপীয় নেতাদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে—হয় তাঁরা চুপচাপ থেকে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হবেন, নয় যুদ্ধে অংশ নিয়ে সামরিক ঝুঁকি নেবেন। তবে তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধ তাঁদের পথ নয়।
মন্তব্য করুন