যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান ক্রমেই মার্কিন ইতিহাসের ভয়াবহতম যুদ্ধগুলির মধ্যে একটি হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা এখন একে রিচার্ড নিক্সনের নেতৃত্বাধীন ভিয়েতনাম যুদ্ধের ‘সম্মানজনক সমাপ্তি’র প্রচেষ্টার সঙ্গে তুলনা করছেন। উভয় ক্ষেত্রেই মার্কিন নেতৃত্ব যুদ্ধ পরিচালনার যৌক্তিকতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়ে নিজেদের রাজনৈতিক মুখ রক্ষার চেষ্টায় মেতেছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই প্রচেষ্টা কতটা ব্যর্থ আর ধ্বংসাত্মক হতে পারে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় নিক্সন প্রশাসন দেশটির বিরুদ্ধে নির্বিচার বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে চেয়েছিল। একইভাবে ট্রাম্পও ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়ে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টির পথ বেছে নিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ছাড়াও বিশাল মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়ে অর্থনৈতিক মহামন্দার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব কি আদৌ যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে?
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে ট্রাম্প বারবার নিক্সনের ভুল পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি করছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের মৃত্যু ও দেশটির ধ্বংসের পর নিক্সন প্রশাসন যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে বাধ্য হয়েছিল। একইভাবে ট্রাম্পও ইরানের বিরুদ্ধে ক্রমাগত সামরিক অভিযান চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের যুদ্ধ পরিচালনার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনার মুখে পড়ছে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন জনগণ যুদ্ধবিরোধী মনোভাব প্রকাশ করেছিল। একইভাবে এখনও বেশিরভাগ মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে চান। তবে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের রাজনৈতিক লাভের হিসেবেই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থেই যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে চান। কিন্তু এর ফলে ইরানিদের মৃত্যু ও ধ্বংস ছাড়াও বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টায় রয়েছে। দেশটির নেতৃত্ব যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করছে এবং বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকিকে রাজনৈতিক দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান বর্তমানে এমন এক অবস্থানে রয়েছে যেখান থেকে তারা যুদ্ধবিরতি আলোচনার পরিবর্তে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতেই বেশি আগ্রহী। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অসম সামরিক কৌশলের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে জ্বালানি তেলের দাম একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ অব্যাহত রাখার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে চায়। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মানবিক ক্ষতির পরিণতি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছেন। তাঁরা মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান স্থগিত করা ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুকেও তাঁর দেশের সামরিক পদক্ষেপ পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তবে ট্রাম্পের যুদ্ধজয়ের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ইরানের অটল অবস্থান এই সম্ভাবনাকে আরও দূরবর্তী করে তুলেছে।
মন্তব্য করুন