মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি এক বিবৃতিতে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য একটি ‘ভূমি অভিযান’ প্রয়োজন হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আপনি আকাশ থেকে বিপ্লব ঘটাতে পারবেন না। এক আয়াতুল্লাহর স্থলে আরেক আয়াতুল্লাহকে আসীন করা সম্ভব নয়।’ এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে ইসরায়েল ও তার মিত্ররা ইরানের অভ্যন্তরে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের দিকে এগোচ্ছে।
নেতানিয়াহু আরও জানান যে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরান আর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ করতে পারবে না। তবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে ইরানের গ্যাস ক্ষেত্রে হামলা স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অথচ ইরান কিন্তু অঞ্চলজুড়ে শক্তিশালী পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। লোহিত সাগরের সৌদি আরবের একটি তেল পরিশোধনাগারে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে ইরান। একইসঙ্গে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনা, কুয়েতের দুটি তেল পরিশোধনাগার এবং ইসরায়েলের একটি তেল পরিশোধনাগারে ক্ষতিসাধন করেছে। ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাস ক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলার জবাবে এই পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে যে তারা ইরানের কারাজের একটি ভূমি থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই কেন্দ্রটি মার্কিন সেনা, প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। গত রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, সৌদি আরব এবং বাহরাইনে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে যে তারা সিরিয়ায় কয়েকটি স্থানে হামলা চালিয়েছে। এর কারণ হিসেবে তারা দ্রুজ জনগোষ্ঠীর উপর হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীর উপর ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হামলা অব্যাহত রয়েছে।
এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে ১,৩০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে বলে ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে এক লক্ষাধিক মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে এবং অন্তত এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে লেবাননের সরকারি সূত্রে জানা গেছে। ইসরায়েলে মাত্র ১৫ জন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৩ জন সামরিক সদস্য এই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। নেতানিয়াহু আবারও জোর দিয়ে বলেছেন যে তিনি কখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যুদ্ধে জড়াননি। তিনি বলেন, ‘কেউ কি সত্যিই বিশ্বাস করে যে কেউ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কোন কিছু করতে বলতে পারে? আমি কারও সাথে প্রতারণা করিনি।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই সংঘাতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তরফ থেকে শান্তির বার্তা এলেও ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই যুদ্ধ যদি আরও বিস্তৃত হয়, তবে তা পুরো অঞ্চলের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশ্ব নেতারা এখনও এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেননি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে।
মন্তব্য করুন