একটি নৃশংস মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্য দিয়ে ইরানে আবারও শুরু হলো সরকারবিরোধী প্রতিবাদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের নতুন অধ্যায়। বৃহস্পতিবার দেশটির সরকার তিনজন ব্যক্তিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। এদের মধ্যে ছিলেন ইরানের জাতীয় কুস্তি দলের তরুণ সদস্য সালেহ মোহাম্মদীও। সরকারের অভিযোগ, তারা জানুয়ারির বিক্ষোভ চলাকালীন দুই পুলিশ অফিসার হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করেছিলেন।
তিনজনকেই ‘মোহারেবেহ’ অর্থাৎ ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সালেহ মোহাম্মদীর মা জানান, তার বয়স ছিল মাত্র উনিশ বছর। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী এই তরুণ কুস্তিগীরকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল বলে অভিযোগ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর। ইরানে সরকারবিরোধী প্রতিবাদের বিরুদ্ধে নতুন করে দমন অভিযান শুরু হয়েছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাগুলো।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, সালেহ মোহাম্মদীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবরটি এখনও পর্যন্ত জানুয়ারির বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রথম সরকারি মৃত্যুদণ্ড। এছাড়া ইরানের বিচার ব্যবস্থায় কোনও স্বাধীন আইনজীবীর সহায়তা না পেয়ে তারা বিচারের মুখোমুখিও হতে পারেননি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অভিযোগ, সালেহসহ তিনজনকে সামরিক আদালতে দ্রুত বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ এবং বিদেশি শক্তির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি। সরকারি সূত্রের দাবি, তারা জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় দুই পুলিশ অফিসার হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন।
এই ঘটনার পর ইরানের সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আরও প্রবল হয়েছে। ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেন মোহসেনি ইজেই স্পষ্ট করেছেন যে সরকারবিরোধী যেকোনও ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই আরও কয়েকশ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান হিউম্যান রাইটস।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। গত মাসেই ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই নিহত হন। সেই ঘটনার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে যুদ্ধের মধ্যেই সরকার আরও বেশি সংখ্যায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে পারে।
ইরানের সরকার দাবি করেছে, জানুয়ারির বিক্ষোভে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ছিল সরকারবিরোধী প্রতিবাদকারী। সরকারের দাবি, এসব হত্যাকাণ্ড ছিল বিদেশি শক্তির দ্বারা চালিত সন্ত্রাসী কার্যকলাপ। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সরকারি দমন অভিযানে আট হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে ইরানকে হুমকি দিয়েছিলেন যে সরকারবিরোধী প্রতিবাদকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নেবে। তবে পরে সে অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে মনোযোগ দেন। চীন-এর পর ইরানই বিশ্বের সর্বাধিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশ বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। গত বছর ইরান কমপক্ষে দেড় হাজার মানুষকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
মন্তব্য করুন