আমি যখন আমার বন্ধুকে বললাম, “আমি খুশি যে আমার মেয়ে আইভি লিগের কলেজ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল”, তখন সে অবাক হয়ে গিয়েছিল। তার মেয়েও তখন উচ্চমাধ্যমিকের শেষ বর্ষে, কলেজ নির্বাচনের ব্যস্ততায় মগ্ন। এমন কথা শুনে স্বাভাবিকভাবেই সে অবাক হয়েছিল। কারণ, আমরা সবাই চাই আমাদের সন্তান যেন সর্বোত্তম কলেজে ভর্তি হতে পারে। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, আমি বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখতে শিখেছি।
প্রতি বছরই উচ্চমাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীরা তাদের কলেজ আবেদনের ফলাফল পায়। ঠিক তেমনই তিন বছর আগে আমার মেয়েও তার কলেজ আবেদনের ফল জানতে পেরেছিল। সে ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করেছিল, যা আইভি লিগের অন্যতম নামকরা প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিকভাবে সে মনে করেছিল, ব্রাউন তার জন্য আদর্শ স্থান হতে পারে। কারণ, ব্রাউনের পরিবেশ ছিল তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাওয়া। সঙ্গীত, চারুকলা আর সাহিত্য চর্চার সুযোগ থাকায় সে বিশ্বাস করেছিল, ব্রাউনই তার স্বপ্নের কলেজ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়।
প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, ব্রাউনে ভর্তি হতে পারলে তার জীবন আরও সুন্দর হতো। কারণ, ব্রুনে ছিল তার পছন্দের সব বৈশিষ্ট্য— ঘণ্টা দেড়েকের দূরত্বে অবস্থিত, আরআইএসডি’র সঙ্গে সংযুক্ত চারুকলা বিভাগ, এমনকি কোনও মূল কোর্সের বাধ্যবাধকতা না থাকা। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় মন খারাপ হয়েছিল। ঠিক যেমনটা হয় যখন কোনও গৃহকর্তা তার পছন্দের বাড়িটি হারান।
আমার মেয়ের যমজ ভাইয়ের প্রথম পছন্দ ছিল ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটি। মেয়েও তার ভাইকে অনুসরণ করে ফোর্ডহ্যামে আবেদন করেছিল। প্রথম দিকে ফোর্ডহ্যাম তার তালিকায় ছিল না। তবে ভাইয়ের কারণে সে সেখানে আবেদন করেছিল। অবশেষে যখন সে ফোর্ডহ্যামে ভর্তির সুযোগ পায়, তখনও তার কোনও উৎসাহ ছিল না। এমনকি সে ক্যাম্পাস ভ্রমণেও রাজি ছিল না। কিন্তু পরে যখন আমি তাকে রাজি করালাম, তখন সে দেখতে পেল সুন্দর ক্যাম্পাস আর শিক্ষার্থীদের উৎসাহ। ফলে ফোর্ডহ্যাম তার তালিকার শীর্ষে চলে আসে।
ফোর্ডহ্যামে ভর্তির পর সে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়। প্রথম বছর সে জীববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিল, কিন্তু প্রি-মেডের প্রতিযোগিতা তার মনঃপূত ছিল না। তবে একটি ইংরেজি বিষয়ের ক্লাস তাকে পুরোপুরি বদলে দেয়। সে আগে থেকেই ইংরেজিতে ভালো ছিল। তাই অ্যাডভান্সড ক্লাসে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। সেখান থেকে তার পরিবর্তন শুরু হয়। বিভাগীয় প্রধান তাকে চিঠি লিখে ইংরেজি বিভাগে যোগ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। এমন ব্যক্তিগত স্বীকৃতি আইভি লিগেও পাওয়া কঠিন হতে পারে।
ইংরেজি বিভাগে যোগ দেওয়ার পর তার জীবনের গতি পরিবর্তিত হয়। জীববিজ্ঞানের ভারী ল্যাব নির্ভরতা থেকে মুক্ত হয়ে সে চারুকলা বিভাগেও দ্বৈত বিষয় হিসেবে ভর্তি হয়। ইংরেজিতে তার অসাধারণ সাফল্যের কারণে সে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ের প্রতিযোগিতামূলক বিভাগেও আবেদন করে। সেখানে নির্বাচিত হওয়ায় সে অত্যন্ত খুশি হয়েছিল।
আমার মেয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে আদর্শ কলেজ সবসময় জীবনের শ্রেষ্ঠ কলেজ নয়। ব্রাউনে ভর্তি না হওয়া তার জীবনে আসলে সুবিধাই করেছে। কারণ, ফোর্ডহ্যাম তাকে অনেক কম খরচে শিক্ষা দিচ্ছে। ব্রাউনের তুলনায় ফোর্ডহ্যামে তার অনেক বেশি বৃত্তি দেওয়া হয়েছে। যার ফলে তার ঋণের বোঝা অনেক কম। এমনকি তার যমজ ভাইও তার সঙ্গে একই কলেজে পড়ছে। ফলে পরিবারের সঙ্গেও তার সম্পর্ক আরো দৃঢ় হচ্ছে।
পরিশেষে বলতে হয়, জীবনে অনেক সময়ই এমন ঘটনা ঘটে যা আমাদের কাছে প্রথমে ভালো মনে হয় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি, তা আসলে আমাদের জন্য কল্যাণকরই হয়েছে। যেমনটা ঘটেছিল আমাদের পরিবারের ক্ষেত্রেও। একটা বাড়ি হারানোর পর আমরা আরও সুন্দর একটি বাড়ি কিনেছিলাম। তেমনি আমার মেয়ের ব্রাউন প্রত্যাখ্যানও তার জীবনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বলাই বাহুল্য, প্রত্যাখ্যান কখনও সুখকর নয়। তবে জীবনের সেরা সুযোগ কখনও প্রত্যাখ্যানের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
মন্তব্য করুন