আইবুপ্রোফেন হলো এমন একটি ওষুধ যা ব্যথা ও জ্বরের উপশমে সহজলভ্য। মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা বা জ্বর হলেই অনেকে এই ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন। তবে জানেন কি, আইবুপ্রোফেন অন্য ওষুধ বা খাবারের সঙ্গে মিশে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে? হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। রক্তক্ষরণ, কিডনির ক্ষতি এমনকি অন্য ওষুধের কার্যকারিতাও কমিয়ে দিতে পারে আইবুপ্রোফেন। তাই এই ওষুধ খাওয়ার সময় কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
আইবুপ্রোফেন ব্যবহারের সময় কোন কোন বিষয়ের সঙ্গে এর প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা জানা থাকলে বিপদ এড়ানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু ওষুধ, খাবার ও পানীয় আইবুপ্রোফেনের সঙ্গে মিশে বিপজ্জনক প্রভাব ফেলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, রক্ত তরলকারী ওষুধ যেমন ওয়ারফেরিনের সঙ্গে আইবুপ্রোফেন খেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই যে কোনো ওষুধ খাওয়ার আগে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
আইবুপ্রোফেন ও রক্ত তরলকারী ওষুধের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় রক্ত তরলকারী ওষুধ যেমন ওয়ারফেরিন, অ্যাপিক্সাবান ইত্যাদির কথা। এই ওষুধগুলো রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়। অন্যদিকে আইবুপ্রোফেনও রক্তের প্লেটলেটের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। যদি এমন কোনো ওষুধ খান তাহলে আইবুপ্রোফেন খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। অকারণে রক্তক্ষরণ হলে তা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
আইবুপ্রোফেন খাওয়ার সময় অন্য ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ যেমন অ্যাসপিরিন বা নেপ্রোক্সেনের সঙ্গেও এটি গ্রহণ করা উচিত নয়। এসব ওষুধ একসঙ্গে খেলে পেটের আলসার ও রক্তক্ষরণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এমনকি ঘন ঘন বা বেশি মাত্রায় খেলে কিডনির ক্ষতিও হতে পারে। তাই ব্যথা উপশমের জন্য একাধিক ব্যথানাশক ওষুধ একসঙ্গে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়া কখনোই এই ধরনের একাধিক ওষুধ একসঙ্গে খাবেন না।
উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য আইবুপ্রোফেন বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ এই ওষুধ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ যেমন এসিই ইনহিবিটর, এআরবি বা ডাইইউরেটিকের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ফলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে বা কিডনির ক্ষতি হতে পারে। তাই উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের নিয়মিত আইবুপ্রোফেন খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। অনিয়ন্ত্রিতভাবে আইবুপ্রোফেন সেবন করলে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক বিপদ হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ব্যবহৃত লিথিয়াম নামক ওষুধের সঙ্গে আইবুপ্রোফেন খেলে বিপদ আরও বেড়ে যায়। আইবুপ্রোফেন রক্তে লিথিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে লিথিয়াম বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর লক্ষণ হিসেবে কাঁপুনি, বিভ্রান্তি, বমিভাব এমনকি অনিয়মিত হৃদস্পন্দন হতে পারে। তাই যারা লিথিয়াম সেবন করেন তাদের আইবুপ্রোফেন খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ক্যান্সার বা অটোইমিউন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত মেথোট্রেক্সেট নামক ওষুধের সঙ্গে আইবুপ্রোফেন খেলেও বিপদ হতে পারে। আইবুপ্রোফেন এই ওষুধটির শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, ফলে রক্তে এর মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই মেথোট্রেক্সেট সেবনকারীদের আইবুপ্রোফেন খাওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা আবশ্যক।
ডিপ্রেশনের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এসএসআরআই শ্রেণির ওষুধ যেমন ফ্লুক্সোলেটিন বা সিটালোপ্রামের সঙ্গে আইবুপ্রোফেন খেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কারণ এই ওষুধগুলোও রক্তের প্লেটলেটের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। তাই এসব ওষুধ খাওয়ার সময় আইবুপ্রোফেন সেবন করা উচিত নয়। যদি ব্যথা উপশমের প্রয়োজন হয় তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে অন্য বিকল্প ওষুধ ব্যবহার করা উচিত।
কিছু ভেষজ সম্পূরক যেমন গিংকো বিলোবা বা রসুনেও রক্ত তরল করার ক্ষমতা রয়েছে। এই সম্পূরকগুলো আইবুপ্রোফেনের সঙ্গে খেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তাই যে কোনো ধরনের সম্পূরক খাওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। বিশেষ করে যারা নিয়মিত আইবুপ্রোফেন সেবন করেন তাদের জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কর্টিকোস্টেরয়েড শ্রেণির ওষুধ যেমন প্রেডনিসোন বা ডেক্সামেথাসোনের সঙ্গে আইবুপ্রোফেন খেলে পেটের আলসার ও রক্তক্ষরণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। কারণ উভয় ওষুধই পাকস্থলীর আস্তরণের ক্ষতি করতে পারে। তাই যারা কর্টিকোস্টেরয়েড ব্যবহার করেন তাদের আইবুপ্রোফেন খাওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
ডায়াবেটিসের রোগীরা যারা ইনসুলিন বা সালফোনাইল ইউরিয়া জাতীয় ওষুধ সেবন করেন, তাদের আইবুপ্রোফেন খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যেতে পারে। আইবুপ্রোফেন এই ওষুধগুলোর কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে বা বাড়িয়ে দিতে পারে, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিক হয়ে যায়। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের আইবুপ্রোফেন খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আইবুপ্রোফেন খাওয়ার সময় অ্যালকোহল পান করাও বিপজ্জনক হতে পারে। অ্যালকোহল পাকস্থলীর আস্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং আইবুপ্রোফেনের কারণে হওয়া রক্তক্ষরণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া অ্যালকোহল যকৃত ও কিডনির উপর চাপ বাড়িয়ে দেয়। তাই আইবুপ্রোফেন খাওয়ার সময় অ্যালকোহল পান করা থেকে বিরত থাকা উচিত। বিশেষ করে যারা নিয়মিত বেশি পরিমাণে অ্যালকোহল পান করেন তাদের ক্ষেত্রে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
আইবুপ্রোফেন খাওয়ার সময় খালি পেটে থাকা উচিত নয়। খালি পেটে আইবুপ্রোফেন খেলে পেটের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই খাবার বা দুধের সঙ্গে আইবুপ্রোফেন গ্রহণ করা উচিত। এছাড়া মসলাদার বা অ্যাসিডিক খাবার এড়িয়ে চলাও পাকস্থলীর ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
আইবুপ্রোফেন ব্যবহারের সময় বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া এড়াতে কিছু নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি। সব ওষুধ ও সম্পূরকের একটি হালনাগাদ তালিকা রাখা উচিত। আইবুপ্রোফেন শুরু করার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। সর্বনিম্ন কার্যকরী মাত্রায় ও স্বল্প সময়ের জন্য আইবুপ্রোফেন ব্যবহার করা উচিত। অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ, পেটের ব্যথা বা হৃদস্পন্দনের পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
আইবুপ্রোফেন অত্যন্ত কার্যকরী একটি ওষুধ হলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা ভুলে গেলে চলবে না। অন্য ওষুধ, সম্পূরক, অ্যালকোহল ও খাবারের সঙ্গে এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানা থাকলে অনেক বিপদ এড়ানো যায়। সবসময় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ রাখা উচিত এবং যে কোনো ওষুধ ব্যবহারের আগে তাদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মন্তব্য করুন