গত সপ্তাহে দক্ষিণ লেবাননের খিয়াম এলাকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের মুখে পড়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তন্মধ্যে স্থানীয় একটি মসজিদের ঐতিহ্যবাহী মিনার ইসরায়েলি বিমান হামলায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। গত ২৩ মার্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তীব্র বিস্ফোরণের ফলে মিনারের উপরের অংশটি ভেঙে পড়ে, আর অবশিষ্ট অংশটি ধুলোয় মিশে যায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদটি কয়েক শতাব্দী পুরোনো বলে ধারণা করা হয়, যার সঙ্গে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
ভিডিও ফুটেজের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি মিনারের ওপর আঘাত হানে। ফলে মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ধোঁয়ার কুণ্ডলে ছেয়ে যায়। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা কয়েকজনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও হতাহতের কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এখনও পাওয়া যায়নি। লেবাননের সরকারি কর্মকর্তারা এই হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিন্দা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দলের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ইসরায়েল ও লেবাননের শিয়া রাজনৈতিক-সামরিক গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘর্ষের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিকাতি এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনতে হবে।
স্থানীয় জনগণের মতে, এই ধরনের হামলা শুধু ধর্মীয় স্থাপনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকেও বিপন্ন করে তুলছে। খিয়াম এলাকার বাসিন্দা মুহাম্মদ আলী (৬৫) বলেন, ‘এই মসজিদটি আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ইসরায়েলি হামলায় এটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুছে যাওয়া।’ তাঁর মতেই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই ধরনের বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
এদিকে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তাদের এই অভিযানটি হিজবুল্লাহর সামরিক স্থাপনাগুলিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছিল। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে স্থানীয় সূত্র ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। কারণ গত কয়েক মাস ধরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দক্ষিণ লেবাননের অনেক বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান উত্তেজনার নতুন মাত্রা যোগ করবে। ইতিমধ্যেই অঞ্চলটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যটন শিল্প স্থবির হয়ে পড়েছে, আর স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘যেকোনও সংঘাতের সময় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। অথচ দক্ষিণ লেবাননের মতো এলাকায় বার বার এমন নির্মম হামলা ঘটছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।’
মন্তব্য করুন