ঈদ মানেই আনন্দ, ভাগাভাগি আর মানুষের প্রতি মানুষের টান। কিন্তু সেই আনন্দ যখন সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের কাছেও পৌঁছে যায়, তখন তা হয়ে ওঠে এক অন্যরকম উদযাপন। বরিশালে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ঠিক এমন এক উদ্যোগ নিয়েছে। নিজেদের পার্টি কার্যালয়ের সীমাবদ্ধতার বাইরে বেরিয়ে তারা আয়োজন করেছে ‘মানবতার ঈদ উৎসব’ নামে এক অনন্য অনুষ্ঠানের। যেখানে উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু ছিল শ্রমজীবী, ভাসমান ও অসচ্ছল মানুষ। পাঁচ বছর ধরে এই উদ্যোগ চালিয়ে আসা দলটি এবার ষষ্ঠবারের মতো আয়োজন করল মানবতার এই মহিমান্বিত উৎসব।
বাসদ নেতারা জানান, মূল উদ্দেশ্য ছিল ঈদের আনন্দকে সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। ভোরবেলা থেকেই শুরু হয় উৎসবের প্রস্তুতি। জেলা বাসদ কার্যালয়ের সামনে ফকিরবাড়ি সড়কে আয়োজন করা হয় শুভেচ্ছা বিনিময় ও আপ্যায়ন অনুষ্ঠানের। শতাধিক শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণে মুখরিত হয়ে ওঠে সেই স্থান। তারপর ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। কাউনিয়া এলাকার বৃদ্ধাশ্রমে শতাধিক প্রবীণদের হাতে তুলে দেওয়া হয় খাবার। এরপর দলটির নেতা-কর্মীরা ছড়িয়ে পড়েন নদীবন্দর, ভাটার খাল, সদর রোডসহ বিভিন্ন এলাকায়। দুই শতাধিক পথশিশু, ভবঘুরে এবং আরও দুই শতাধিক অসচ্ছল মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয় রান্না করা খাবার।
ঈদের দিনের এই মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে ছিল উৎসবের চিরচেনা স্বাদ। খাবারের তালিকায় ছিল পোলাও, রোস্ট, ডিম ও সেমাই। কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার প্রকাশ। লঞ্চঘাট এলাকায় খাবার পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ভবঘুরে আলতাফ হোসেন। তাঁর কথায় উঠে আসে জীবনের কঠিন বাস্তবতা—‘ঈদের দিন সবাই ভালোমন্দ খায়। আমাদের তো সেই সামর্থ্য নেই। তবু তারা আমাদের কষ্টের কথা মনে রেখে ভালোমন্দ খাবার দিয়েছে। না পেলে ঈদের দিনও না খেয়েই থাকতে হত।’
এই আয়োজনের পেছনে ছিল কয়েক দিনের কঠোর প্রস্তুতি। গত শুক্রবার রাত থেকেই শুরু হয় রান্নার কাজ। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া থাকা সত্ত্বেও থেমে থাকেননি আয়োজকেরা। স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নিয়েছেন ছাত্র ফ্রন্ট, শ্রমিক ফ্রন্টসহ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা। রান্নার কাজে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবী কাওসার হোসেন বলেন, ‘ঈদের আগের দিন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ থাকলেও কয়েক বছর ধরে স্বেচ্ছায় এই কাজে যুক্ত হয়ে গেছি। শ্রমজীবী আর দুস্থ মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করতে পারা সত্যিই অন্যরকম এক ভালোলাগার অনুভূতি।’
ছাত্র ফ্রন্টের জেলা সদস্য মো. রাকিব বলেন, কয়েক বছর ধরে এই উদ্যোগে যুক্ত থেকে তাঁরা অনুভব করছেন মানবতার জন্য কাজ করার একধরনের তৃপ্তি। উৎসবের দিন উপস্থিত ছিলেন বাসদ বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক মনীষা চক্রবর্তী, কেন্দ্রীয় বর্ধিত ফোরামের সদস্য ইমাম হোসেন, জেলা শাখার সদস্য শহিদুল শেখ, বেল্লাল গাজী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট বরিশাল মহানগর শাখার আহ্বায়ক সুজন আহমেদ, সদস্য সচিব ফারজানা আক্তার প্রমুখ।
মনীষা চক্রবর্তী জানান, ছয় বছর ধরে ঈদের দিন তাঁরা এই মানবতার ঈদ উৎসবের আয়োজন করছেন। তবে তাঁর অভিজ্ঞতা বলে, এমন উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে হওয়া প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের উচিত অসচ্ছল মানুষদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। ভবিষ্যতেও এই আয়োজন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘এর পরিধি আরও বাড়াব। যাতে সমাজের আরও বেশি মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া যায়।’ একই সঙ্গে যাঁরা স্বেচ্ছাশ্রম ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বরিশালের এই ক্ষুদ্র উদ্যোগ শুধু একটি দিনের আয়োজন নয়, এটি হয়ে উঠেছে সহমর্মিতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা আর মানবিকতার এক জীবন্ত উদাহরণ। যেখানে শ্রেণি ও অর্থের ব্যবধান ভেঙে মানুষে মানুষে গড়ে উঠেছে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। এই উদ্যোগ শুধু ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এক বার্তাও বয়ে আনে।
মন্তব্য করুন