বিশ্বখ্যাত ডিজনি কোম্পানির প্রাক্তন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বব আইগার এখন আর তাঁর সেই পদে নেই। গত ১৮ মার্চ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ডিজনি নেতৃত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন জশ ডি’আমারো, যিনি ডিজনি এক্সপেরিয়েন্সেস বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রায় দুই দশকের নেতৃত্বে আইগার ডিজনিকে নিয়ে গিয়েছেন এক নতুন উচ্চতায়। তাঁর নেতৃত্বে কোম্পানিটি করেছে একাধিক বিশাল অর্জন, যার ফলে ডিজনির থিম পার্কগুলো রেকর্ড আয় করেছে এবং বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়েছে।
২০০৫ সালে ডিজনির দায়িত্ব গ্রহণের পর আইগার কোম্পানির জন্য অন্যতম লাভজনক কয়েকটি অধিগ্রহণের নেতৃত্ব দেন। এর মধ্যে রয়েছে পিক্সার ($৭.৪ বিলিয়ন), মার্ভেল ($৪ বিলিয়ন) এবং লুকাসফিল্ম ($৪ বিলিয়ন) কেনা। এছাড়া ২০১৬ সালে তিনি চিনে শাংহাই ডিজনিল্যান্ড নির্মাণ করে নতুন বাজার উন্মোচন করেন। তাঁর নেতৃত্বে ডিজনি হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বিনোদন প্রতিষ্ঠান।
বব আইগার জন্মেছিলেন ১৯৫১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কে। তাঁর বাবা আর্থার ছিলেন একজন মার্কেটিং শিক্ষক এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নৌবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মা মিরিয়াম ছিলেন একজন গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই আইগারের স্বপ্ন ছিল একজন সংবাদ উপস্থাপক হওয়া। কলেজ জীবনে তিনি আইথাকা কলেজ থেকে স্নাতক হন এবং একটি স্থানীয় টিভি অনুষ্ঠান ‘ক্যাম্পাস প্রোব’ উপস্থাপনা করতেন। পরবর্তীকালে তিনি নিউ ইয়র্কের একটি টিভি স্টেশনে আবহাওয়াবিদ হিসেবে কাজ শুরু করেন, যদিও খবরে বলা হয় তিনি এই কাজে তেমন দক্ষ ছিলেন না।
১৯৭৪ সালে আইগারের কর্মজীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তাঁর এক চাচার সুপারিশে তিনি এবিসি নেটওয়ার্কে কাজ শুরু করেন। শুরুতে সেটে কাজ করতেন তিনি সপ্তাহে মাত্র ১৫০ ডলার বেতনে। পরবর্তীকালে তিনি এবিসির স্টুডিও সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ পান। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই সময়েই তিনি টিভি প্রযোজনার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন এবং কঠোর পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে তিনি এবিসির বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি এবিসি এন্টারটেইনমেন্টের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বেই নির্মিত হয় জনপ্রিয় সব টিভি শো যেমন ‘ডুগি হাউজার’, ‘টুইন পিকস’ এবং ‘আমেরিকা’স ফানিয়েস্ট হোম ভিডিওজ’।
১৯৯৪ সালে আইগার এবিসির প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। যখন ১৯৯৫ সালে ডিজনি এবিসিকে অধিগ্রহণ করে, তখন আইগার তাঁর দক্ষতা প্রদর্শন করতে থাকেন। তিনি পরবর্তীকালে ওয়াল্ট ডিজনি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৫ সালে তিনি ডিজনির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর নেতৃত্বে ডিজনি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আইগারের নেতৃত্বে ডিজনি করেছে একাধিক উল্লেখযোগ্য অধিগ্রহণ। পিক্সার, মার্ভেল এবং লুকাসফিল্ম অধিগ্রহণের মাধ্যমে তিনি ডিজনিকে একটি বিশাল বিনোদন সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। এছাড়া তিনি ডিজনির থিম পার্কগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করেন। ২০১৬ সালে চিনে শাংহাই ডিজনিল্যান্ড নির্মাণ এবং ২০২৫ সালে আবুধাবিতে নতুন একটি থিম পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা তাঁর নেতৃত্বেরই ফসল। তাঁর নেতৃত্বে ডিজনির স্টক মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কোম্পানিটি বিশ্বব্যাপী বিনোদন শিল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
আইগার রাজনীতিতেও কিছুটা জড়িত ছিলেন। তিনি প্রথমে ডেমোক্র্যাট হিসেবে নিবন্ধিত ছিলেন, পরে স্বাধীন হিসেবে পরিবর্তন করেন। তিনি হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করেছিলেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি নীতি বিষয়ক ফোরামেও সদস্য ছিলেন। যদিও তিনি নিজে রাজনীতিতে যোগদানের কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করেননি। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিসান্টিসের এলজিবিটিকিউ+ বিরোধী নীতির বিরোধিতা করে আলোচনায় আসেন।
২০২০ সালে আইগার অবসর গ্রহণের ঘোষণা দিলেও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে তিনি আবার ডিজনির প্রধান নির্বাহী হিসেবে ফিরে আসেন। যদিও তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ডিজনির ব্যবসায়িক অবস্থা পূর্বের তুলনায় আরও খারাপ হয়ে পড়ে। স্টকের দরপতন এবং ব্যর্থ চলচ্চিত্র প্রকল্পের কারণে শেয়ারহোল্ডাররা তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে ২০২৪ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সভায় তিনি পরিচালনা পর্ষদের দুইটি আসন ধরে রাখতে সক্ষম হন।
আইগার চার সন্তানের জনক। তাঁর প্রথম স্ত্রী ক্যাথলিন সুসানের গর্ভে দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীকালে তিনি উইলো বে নামক এক সাংবাদিককে বিয়ে করেন, যিনি পরবর্তীকালে ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যানেনবার্গ স্কুল অফ জার্নালিজমের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই দম্পতির দুই পুত্র রয়েছে। আইগারের জীবনের শেষ দিকে তাঁর বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ৪৫.৮ মিলিয়ন ডলার।
ডিজনির নতুন প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জশ ডি’আমারো। আইগার তাঁর অবসর গ্রহণের পূর্বে এক বার্তায় বলেন, ডিজনি পরিবারের সব সদস্য, অংশীদার এবং ভক্তদের প্রতি তাঁর আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চান। তিনি বলেন, “আপনাদের বিশ্বাস এবং স্মৃতি আমাকে যে সম্মান ও সম্মাননা প্রদান করেছে, তার তুলনা হয় না।” আইগারের অবসর গ্রহণের মধ্য দিয়ে ডিজনির এক নতুন অধ্যায় শুরু হলেও তাঁর নেতৃত্বের প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হবে বহুদিন।
মন্তব্য করুন