আমাদের মনের মধ্যে প্রতিনিয়ত কত শত দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খায়, যেগুলো আমাদের জীবনকে করে তোলে দুর্বিষহ। অফিসের কাজ নিয়ে চিন্তা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—এসবই আমাদের মনকে ভারাক্রান্ত করে রাখে। কিন্তু কীভাবে এই দুশ্চিন্তাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়? সম্প্রতি এক অভূতপূর্ব কৌশলের কথা জানা গেছে, যার নাম ‘দুশ্চিন্তার জানালা’ (Worry Window)। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দুশ্চিন্তা করার মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়।
স্বাস্থ্য বিষয়ক সাংবাদিক কিম স্কেভিটজ দুই সপ্তাহ ধরে এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তার অভিজ্ঞতা বলছে, এই পদ্ধতি কিছুটা হলেও কাজে দিয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, আরও বেশি ফল পেতে হলে কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। দুশ্চিন্তার জানালা পদ্ধতিতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি সময়ে (১৫ থেকে ৩০ মিনিট) শুধু দুশ্চিন্তা করার জন্য আলাদা করে রাখা হয়। এই সময়ের বাইরে মনে দুশ্চিন্তা আসলে তা লিখে রাখা হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়। এর ফলে মনোযোগ থাকে বর্তমান মুহূর্তে, এবং দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো দুশ্চিন্তাকে সাময়িকভাবে স্থগিত করা এবং মনকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনা। মানসিক চিকিৎসকদের মতে, এটি কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির (CBT) একটি অংশ।CBT-এর মূলনীতি হলো আমাদের চিন্তাভাবনা এবং কর্মকাণ্ড আমাদের অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘমেয়াদে এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। তবে বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ এটি একটি অবসাদজনক কাজ।
কিম স্কেভিটজ দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে আটটার মধ্যে দশ মিনিট করে দুশ্চিন্তার জানালা অনুসরণ করেছেন। তিনি তার কাজের তালিকা লিখেছেন, অতীতের দুশ্চিন্তাগুলো বিশ্লেষণ করেছেন, এমনকি নিজের প্রতি নেতিবাচক কথাগুলোও লিপিবদ্ধ করেছেন। এর ফলে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, অনেক দুশ্চিন্তাই আসলে অমূলক। কাজের তালিকা বিশ্লেষণ করে তিনিPrioritize করতেও সক্ষম হন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এটি একটি কঠিন অভ্যাস ছিল, কারণ প্রতিদিন দশ মিনিট করে দুশ্চিন্তা করা আসলে আনন্দদায়ক ছিল না।
মানসিক চিকিৎসক ড. সাইমন রেগো বলেন, যাদের জীবনে দীর্ঘদিন ধরে দুশ্চিন্তার অভ্যাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে। তবে এর জন্য নিয়মিত অনুশীলন প্রয়োজন। তিনি বলেন, “এটি একটি স্বল্পমেয়াদি ত্যাগ, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করবে।” অন্যদিকে, ড. সারাহ বার্জার বলেন, বেশিরভাগ মানুষই এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে চায় না, কারণ এটি আনন্দদায়ক নয়। তবে যারা নিয়মিত চর্চা করেন, তাদের জন্য এটি খুবই উপকারী হতে পারে।
কিম স্কেভিটজ স্বীকার করেছেন, দুই সপ্তাহ পর তিনি আর এই অভ্যাস চালিয়ে যেতে পারেননি। তবে তিনি মনে করেন, আরও বেশি সময় ধরে এবং নিয়ম মেনে এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। তিনি আবারও এই পদ্ধতি অনুসরণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যখন তিনি পুরোপুরি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবেন। তাই বলা যায়, দুশ্চিন্তার জানালা একটি সম্ভাবনাময় কৌশল হলেও, এটি দ্রুত ফল দেবে না। দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে হলে নিয়মিত অনুশীলন এবং ধৈর্য ধরা জরুরি।
মন্তব্য করুন