পবিত্র রমজান মাসের ইফতার থেকে শুরু করে সারা বছরই বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এখন খেজুরের চাহিদা ব্যাপক। কারণ খেজুরের গুণাগুণই এমন যে, তা দেহ ও মনের সকল দুর্বলতা দূর করতে সক্ষম। তবে খেজুরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এমন একটি প্রাচীন ও পবিত্র পানীয়ের রহস্য, যা মুসলিম বিশ্বে সুন্নতি পানীয় হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এই পানীয়টির নামই হলো ‘নাবীয’। শত শত বছর ধরে মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত এই পানীয়টির উপকারিতা নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাঝে।
খেজুর দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি নাবীয শুধু ধর্মীয় গুরুত্বই বহন করে না, বরং এর রয়েছে দেহের জন্য নানাবিধ চিকিৎসাগত উপকারিতা। ইসলামিক ইতিহাসের সূত্র অনুযায়ী, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগ থেকেই এই পানীয়টি মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল। বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানীরাও এর উপকারিতার কথা স্বীকার করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নাবীয শরীরের হজমশক্তি বৃদ্ধি করা থেকে শুরু করে ডিটক্সিফিকেশন, শক্তি সরবরাহ, হাড়ের জোড় ও লিভারের স্বাস্থ্য রক্ষাসহ একাধিক উপকার করে থাকে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, খেজুরের মধ্যে থাকা উচ্চমাত্রার ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন এবং প্রাকৃতিক চিনি শরীরের জন্য এক অনন্য পুষ্টি উপাদান হিসেবে কাজ করে। নাবীয তৈরির প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত সহজ: মাত্র একশো গ্রাম খেজুর এক লিটার বিশুদ্ধ পানিতে বীজসহ ভিজিয়ে রাখতে হয় বারো থেকে চব্বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত। তারপর সেই পানীয়টি ছেঁকে নিয়ে সকালে খালি পেটে পান করলে এর সর্বোচ্চ উপকারিতা পাওয়া যায়। এমনকি ভেজানো খেজুরগুলোও খাওয়া যেতে পারে, যা আরও বেশি পুষ্টি যোগায় শরীরে।
নাবীযের প্রধান উপকারিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে হজমশক্তির উন্নতি। খেজুরের উচ্চ ফাইবার উপাদান এবং ক্ষারধর্মী বৈশিষ্ট্য পাকস্থলীর অ্যাসিডের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। ফলে অ্যাসিডিটি কমে এবং হজম প্রক্রিয়া সহজ হয়। এছাড়া, এটি শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করতে সাহায্য করে বলে ডিটক্সিফিকেশনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মূত্রবর্ধক ও প্রদাহনাশক গুণ কিডনির সমস্যাও কমাতে সাহায্য করে।
শক্তির উৎস হিসেবেও নাবীয অতুলনীয়। প্রাকৃতিক চিনি যেমন গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ এবং খনিজ পদার্থ যথা পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও আয়রনের উপস্থিতির কারণে এটি দ্রুত শক্তি জোগায়। বিশেষ করে যারা কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চান বা দ্রুত ক্লান্তি দূর করতে চান, তাদের জন্য এটি আদর্শ পানীয়। এছাড়া, নাবীয হাড়ের জোড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায়ও কার্যকরী। আর্থ্রাইটিস রোগীদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী। এটি ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে এবং গিঁটেবাত নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
লিভার, প্লীহা ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির প্রদাহ কমাতেও নাবীয সাহায্য করে। এটি গলা ও বুকের শ্লেষ্মা নিষ্কাশন করে এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নাবীয রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, নাবীয তৈরির পর বারো থেকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তা পান করা উচিত। কারণ এরপর এটি ফারমেন্ট হতে শুরু করে এবং তখন এর উপকারিতা কমে যেতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মানুষ ক্রমাগত অসুস্থতা ও ক্লান্তির শিকার হচ্ছে, সেখানে প্রাচীন এই পানীয়টি হতে পারে এক অনন্য সমাধান। ইসলামিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি এর চিকিৎসাগত উপকারিতা বিজ্ঞান দ্বারা স্বীকৃত হওয়ায় এর প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেজুরের মতো সহজলভ্য উপাদান দিয়ে তৈরি এই পানীয়টি নিয়মিত গ্রহণ করলে অনেক রোগ থেকেই মুক্ত থাকা সম্ভব। তাই স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের উচিত নিজেদের জীবনযাত্রায় নাবীয অন্তর্ভুক্ত করা।
মন্তব্য করুন