জীবনে অনেক কিছুই আমরা হারিয়ে ফেলি—যাদের সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি, তাদের কথা জানার সুযোগও হয়তো আর আসে না। কিন্তু পরিবারের পুরোনো গয়না, ছবির অ্যালবাম কিংবা অন্যান্য উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সামগ্রী হয়ে উঠতে পারে সেই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির দ্বার। এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন এক তরুণী, যিনি কখনো তাঁর ঠাকুরমাকে দেখেননি। তাঁর ঠাকুরমা মারা যান মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে, যখন তাঁর মা ছিলেন একুশ বছরের যুবতী। নিজের পরিবারের ইতিহাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ থাকলেও মা তাঁকে কখনোই তাঁর ঠাকুরমা বা অন্যান্য আত্মীয়দের কথা খুলে বলেননি। ধারণা করা হতো যে, অতীতের স্মৃতিগুলো তাঁর জন্য যথেষ্ট যন্ত্রণাদায়ক।
কিন্তু একদিন উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গেল তাঁর ঠাকুরমার পুরোনো গয়না—একটি ব্রেসলেট আর তাঁর বিবাহের আংটি। সেই সঙ্গে মিলল এক পুরোনো পরিবারের ছবির অ্যালবাম। এই সামগ্রীগুলোই হয়ে উঠল সেই সূত্র, যা তাঁর মা আর তাঁর মধ্যে খুলে দিল অতীতের অনেক গোপন কথা। তিনি তাঁর মাকে একটি বার্তা পাঠান, যেখানে তিনি ছবিতে তাঁর ঠাকুরমাকে ব্রেসলেট পরিহিত অবস্থায় দেখিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি তাঁকে এই ব্রেসলেট পরতে দেখেছো কখন?’ এই প্রশ্নটিই যেন ভেঙে দিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা নীরবতা। মা তাঁকে জানালেন ঠাকুরমা সম্পর্কে অনেক কথা—তাঁর জীবনযাত্রা, তাঁর ব্যক্তিত্ব, এমনকি তাঁর স্বামীর সঙ্গে বিবাহের পূর্বের সেই মুহূর্তটিও।
ছবির অ্যালবাম খুলে দেখা গেল তাঁর দাদু-ঠাকুরমাকে—দেখতে খুবই যুবক। মা জানালেন, এই ছবিটি তোলা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, যখন তাঁর দাদু বিমানবাহিনী থেকে ফিরে এসেছেন। তাঁর বুকের ওপর দেখা যাচ্ছে যুদ্ধের সম্মানজনক পদক। মা আরও জানান, এই ছবি তোলার কিছুদিন পরেই তাঁদের বিবাহ হয়েছিল। ছবিটির দিকে তাকিয়ে লেখিকা অনুভব করলেন তাঁদের প্রথম প্রজন্মের ইতালীয়-আমেরিকান পরিবারের প্রেমের গল্প, আর তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া দক্ষিণ ও উত্তর ইতালির সংস্কৃতির মিলনের মুহূর্ত।
পুরোনো গয়না আর ছবির সূত্র ধরে আরও অনেক কথা উঠে এল। তাঁর ঠাকুরমার বিবাহের আংটিটি ছিল একটি নীলচে সবুজ রঙের ক্ষুদ্র বাক্সে সংরক্ষিত। লেখিকা সেই বাক্সের গায়ে জুয়েলারি দোকানের নাম দেখে অনলাইনে অনুসন্ধান শুরু করেন। দেখা গেল সেই দোকানটি এখনো নিউইয়র্কের স্টেইনওয়ে স্ট্রিটে টিকে আছে—যেখানে তাঁর ঠাকুরমা বসবাস করতেন সেই সময়। এই ছোট্ট অনুসন্ধান তাঁকে নিয়ে গেল তাঁর দাদুর সেই বিশেষ দিনটিতে, যখন তিনি তাঁর প্রিয়তমার জন্য আংটিটি কিনেছিলেন। ধারণা করা যায়, সেই মুহূর্তে তাঁর আনন্দ কতটা অপরিসীম ছিল।
ছবিগুলো তাঁর ঠাকুরমার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও অনেক কিছু বলে দিয়েছিল। পঞ্চাশের দশকে তাঁদের পরিবার নিউ হ্যাম্পশায়ারে চলে আসেন। ছবিতে দেখা যায়, শহুরে স্টাইল কখনোই ছাড়েননি তাঁর ঠাকুরমা—যেখানে তিনি ছিলেন অনেক বেশি পরিচিত। লেখিকা তাঁর মাকে আরও ছবি দেখিয়ে জানতে পারেন, সেই সময়টা তাঁদের জন্য কতটা কঠিন ছিল। নিউ হ্যাম্পশায়ারে তাঁদের পরিচিতজন ছিল না, পরিচিত খাবার পাওয়া যেত না, এমনকি ডাক্তারের সঙ্গেও পরিচিত হওয়া ছিল দুরূহ। কিন্তু তাঁরা সেই কঠিন সময়টিও জয় করেছিলেন। লেখিকা অনুভব করলেন, তাঁর পরিবারের এই সংগ্রামী মনোভাব তাঁর রক্তেই মিশে আছে।
ছবিগুলো আর গল্পগুলো তাঁর মা আর তাঁর মধ্যে গড়ে তুলেছে এক গভীর সম্পর্ক। তিনি জানতে পারেন তাঁর ঠাকুরমা ছিলেন অত্যন্ত প্রফুল্ল স্বভাবের, সবার সঙ্গে সহজেই মিশতে পারতেন, রান্না করতে ভালোবাসতেন, কিন্তু পরিবারের জন্য সময় দিতে গিয়ে প্রায়শই থালাবাসন ভিজিয়ে রাখতেন। তাঁর দাদু ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত মানুষ—প্রতিদিনই তিনি পূর্ণবসন পরতেন, এমনকি অবসরের পরেও তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত কাঠমিস্ত্রি। এই গল্পগুলো শুনে লেখিকা অনুভব করলেন, তাঁর ঠাকুরমা যেন তাঁর জীবনে আরও কাছের হয়ে উঠলেন—যাঁর সঙ্গে দেখা না হলেও তাঁর রক্তের সম্পর্ক তাঁকে অনুপ্রাণিত করছে প্রতিনিয়ত।
এই অভিজ্ঞতা লেখিকা আর তাঁর মাকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। মা তাঁকে জানিয়েছেন, এই আলোচনাগুলো তাঁদের দুজনের জন্যই নিরাময়কর হয়েছে। পুরোনো স্মৃতিগুলো উন্মোচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন নতুন এক বন্ধন। লেখিকা এখন তাঁর সন্তানদের কাছে এই গল্পগুলো পৌঁছে দিতে চান। তিনি বিশ্বাস করেন, একটা ছবি, একটা গয়না বা একটা পুরোনো সামগ্রীর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অনেক জীবনের গল্প—যেগুলোকে সযত্নে আগলে রাখা উচিত।
মন্তব্য করুন