যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ও আলোচিত ব্যক্তিত্বদের একজন ছিলেন রবার্ট মুলার। ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)-এর প্রাক্তন পরিচালক হিসেবে তিনি শুধু গোয়েন্দা সংস্থাটির ইতিহাসেই নয়, মার্কিন রাজনীতিতেও রেখে গেছেন অনন্য ছাপ। শুক্রবার তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।
মুলারের জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের সময় তার নেতৃত্বে পরিচালিত রাশিয়া হস্তক্ষেপ তদন্ত। ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের তদন্তে তিনি যে দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্ব দেখিয়েছিলেন, তা তাকে রাজনৈতিক মহলের চক্ষুশূল করে তোলে। এমনকি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিরুদ্ধে বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
রবার্ট মুলারের জন্ম হয়েছিল নিউ ইয়র্ক শহরে, ১৯৪৪ সালের ৭ই আগস্ট। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ আইনজীবী ও সামরিক কর্মকর্তা। ভিয়েতনাম যুদ্ধে তিনি সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, যার জন্য তাকে ব্রোঞ্জ স্টার পদকেও ভূষিত করা হয়েছিল। যুদ্ধ থেকে ফিরে তিনি আইন পেশায় যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে ফেডারেল সরকারের উচ্চ পদে আসীন হন। ২০০১ সালে তিনি এফবিআই-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যার সময়কাল ছিল মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম সন্ধিক্ষণ।
তার নেতৃত্বে এফবিআই ব্যাপক সংস্কারের মুখোমুখি হয়। তিনি সংস্থাটির প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, গোয়েন্দা কার্যক্রমের আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষত, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের সময় তার নেতৃত্ব ছিল অপরিহার্য। কিন্তু তার সর্বাধিক আলোচিত কাজটি ছিল ২০১৬ সালের নির্বাচনী হস্তক্ষেপ তদন্তের নেতৃত্ব দেওয়া। এফবিআই-এর তদন্ত দলকে নির্দেশ দিয়ে তিনি প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন যে রাশিয়া নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছিল। এই তদন্তের ফলে মার্কিন রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের সূচনা হয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে যোগসাজশ করেছিলেন। যদিও মুলারের তদন্তে সরাসরি ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করা হয়নি, তবুও তদন্ত দলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার সময় রাশিয়ার কাছ থেকে সহায়তা নিয়েছিলেন। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প মুলারকে বারবার আক্রমণ করেন এবং তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেন। তবে মুলার তার পেশাদারিত্বে কোনও ছাড় দেননি এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্ত চালিয়ে যান।
মুলারের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের মধ্যে ছিল ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর এফবিআই-এর ব্যর্থতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান। এছাড়া তিনি হোয়াইট কলার অপরাধ দমনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার কর্মজীবনের শেষ দিকে তিনি এফবিআই-এর পরিচালক পদ থেকে অবসর নিয়ে ব্যক্তিগত আইন পেশায় ফিরে যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি একজন সম্মানিত আইনজীবী হিসেবে কাজ করে গেছেন।
রবার্ট মুলারের মৃত্যু মার্কিন রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাল। তার পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা আজও বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। তার জীবন ও কর্মকে ঘিরে আলোচনা চলবে বহু বছর ধরে। মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
মন্তব্য করুন