২০০৩ সালের ২০ মার্চ। ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল সেদিন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রবাহিনী ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। বিশ্ববাসী তখন রুদ্ধশ্বাসে প্রতীক্ষা করছিল এই সংঘাতের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের দিকে। ইরাক যুদ্ধ, যার কোডনেম ছিল ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’, তা শুরু হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নির্দেশে। ইরাকের তৎকালীন নেতা সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মজুত রাখার অভিযোগ ছিল মূল কারণ। যদিও পরবর্তীকালে সেই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই মার্কিন বিমানবাহিনী ইরাকের রাজধানী বাগদাদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরাকের সেনাবাহিনী এবং সরকারি স্থাপনাগুলিকে ধ্বংস করে দেওয়া। ইরাকি সেনাবাহিনীও পাল্টা জবাব দেয়, কিন্তু মার্কিন প্রযুক্তির সামনে তাদের প্রতিরোধ ছিল অনেকাংশেই অকার্যকর। যুদ্ধের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাগদাদের বিভিন্ন স্থানে বিধ্বস্ত ভবন এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলী চোখে পড়ে বিশ্ববাসীর। টেলিভিশনের পর্দায় সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছিল এই যুদ্ধের বিভীষিকা।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে যায়। ইরাক বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়ায় এই সংঘাতের প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক এবং সুদূরপ্রসারী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জোটবদ্ধ দেশগুলি ইরাকের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একাংশ এই যুদ্ধকে অন্যায় আগ্রাসন বলে অভিহিত করেছিল। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছিলেন।
ইরাক যুদ্ধের প্রথম দিনটি ছিল সংঘাতের এক ভয়াবহ সূচনা। পরবর্তী নয় বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, যার মধ্যে অসংখ্য বেসামরিক নাগরিকও ছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও ইরাকের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে অনেক সময় লেগেছিল। এই যুদ্ধের প্রভাব এখনও বিশ্ব রাজনীতিতে অনুভূত হচ্ছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে।
আজ থেকে বিশ বছর আগের সেই দিনটির স্মৃতি আজও অনেকের মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। যুদ্ধের বিভীষিকা দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে। ইরাক যুদ্ধ কি সত্যিই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছিল, নাকি ছিল ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের লড়াই? ইতিহাসের এই অধ্যায়টি বারবার আমাদেরকে যুদ্ধের নির্মমতা এবং শান্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে তুলছে।
মন্তব্য করুন