আমেরিকানদের মধ্যে সবথেকে কম গুরুত্ব পাওয়া কাজগুলির মধ্যে অন্যতম হলো অর্থ পরিকল্পনা। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গড়ে একজন আমেরিকান দিনে মাত্র দুই মিনিটের মতো সময় ব্যয় করেন তাঁদের অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে—যেমন বাজেট তৈরি, সঞ্চয়, বিনিয়োগ কিংবা অবসর পরিকল্পনা। অথচ একই ব্যক্তি দিনে গড়ে প্রায় আধঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করেন ঘরের কাজে, যেমন ধোঁয়া-মাজা ইত্যাদিতে। অর্থাৎ অর্থ পরিকল্পনায় তাঁদের সময় লাগে এক কাপ কফি বানাতে যে সময় লাগে তারও অর্ধেকের কম!
এই উদ্বেগজনক তথ্যটি সামনে এসেছে মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ২.৭ শতাংশ আমেরিকান দিনের যেকোনো সময়ে অর্থ পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকেন। বিগত দুই দশক ধরে এই হার ক্রমাগত কমছে। এমনকি অনেকের ক্ষেত্রে অর্থ পরিকল্পনা শুরুই হয় সঙ্কট দেখা দিলেই—হঠাৎ কোনো বিল আসা কিংবা চাকরি হারানো ইত্যাদি পরিস্থিতিতে।
অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হওয়া আমেরিকানদের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৫ শতাংশ) অর্থ পরিকল্পনা শুরু করেন শুধুমাত্র সঙ্কটের সময়েই। ‘মটলি ফুল মানি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই প্রবণতা জেনারেল এক্স গোষ্ঠীর মধ্যে বেশি—৩০ শতাংশ। অন্যদিকে জেনারেল জেড এবং মিলেনিয়ালদের মধ্যে এই হার ২১ শতাংশ। বেবি বুমারদের মধ্যে নিয়মিত অর্থ পরিকল্পনা করার প্রবণতা বেশি—৫০ শতাংশ।
অর্থ পরিকল্পনায় এতটা অনাগ্রহের কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকেও দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৪৪ শতাংশ আমেরিকান তাঁদের দৈনন্দিন খরচের তুলনায় বেশি অর্থ জমা রাখতে পারেন। ৫৫ শতাংশের কাছে তিন মাসের জরুরি সঞ্চয়ও নেই। গত এক বছরে গড় মাসিক খরচ বেড়েছে প্রায় একশো ডলার, আর পরিবারের ঋণের বোঝাও বেড়েই চলেছে।
অর্থ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বয়স এবং লিঙ্গভেদেও পার্থক্য রয়েছে। শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে মাত্র ০.৮ শতাংশ দিনের যেকোনো সময় অর্থ পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এই হার ২.৩ শতাংশ। অবসরপ্রাপ্তদের কাছে নিয়মিত অর্থ পরিকল্পনার দায়িত্ব বেশি থাকে—স্থায়ী আয়, মাসিক খরচ ইত্যাদির কারণে তাঁরা বেশি সময় ব্যয় করেন এই বিষয়ে। এছাড়াও দেখা গেছে, মহিলারা পুরুষদের তুলনায় সামান্য বেশি সময় অর্থ পরিকল্পনায় ব্যয় করেন—৩.০ শতাংশ বনাম ২.৪ শতাংশ।
অর্থ পরিকল্পনায় সময় না দেওয়ার ফলে ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনিক দুই মিনিটের মতো সময় ব্যয় করেই অর্থ পরিকল্পনা শুরু করা সম্ভব। শুরুতে ছোট ছোট পদক্ষেপ—যেমন মাসিক বাজেট তৈরি করা, উচ্চ সুদের সঞ্চয়ী হিসাব খোলা, জরুরি তহবিল গড়ে তোলা ইত্যাদি। ধীরে ধীরে নিয়মিত অর্থ পরিকল্পনার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে।
অর্থ পরিকল্পনা শুরু করার জন্য বিশেষজ্ঞরা কিছু সহজ পদক্ষেপের কথা বলেছেন। প্রথমত, নিজের স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এরপর মাসিক আয় এবং খরচের হিসাব রাখা শুরু করতে হবে। জরুরি তহবিল তৈরির জন্য প্রতি মাসে কিছু অর্থ সঞ্চয় করা উচিত। ঋণের ক্ষেত্রে উচ্চ সুদের ঋণ দ্রুত পরিশোধের দিকে নজর দিতে হবে। অবসর পরিকল্পনার জন্য কর্মক্ষেত্রের অবসর পরিকল্পনা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা যেতে পারে। সবশেষে, প্রতি মাসে একবার হলেও অর্থ বিষয়ক পর্যালোচনা করার জন্য সময় বের করতে হবে।
অর্থ পরিকল্পনা নিয়মিত করার জন্য সময় নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ‘ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং টিম লিড’ অ্যামান্ডা কিশ বলেন, “অর্থ পরিকল্পনা একবার করে শেষ করার মতো বিষয় নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই যদি সত্যিই অর্থ পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তাহলে তা অবশ্যই আপনার দৈনিক রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করুন।”
মন্তব্য করুন